শুক্রবার ৬ই জানুয়ারী ২০১৭ বিকাল ০৫:২১:২৬

বঞ্চিতদের আলোর দিশা জাবির ‘তরী’

মাহবুব আলম, জাবি করেসপন্ডেন্ট, ব্রেকিংনিউজ.কম.বিডি

বঞ্চিতদের আলোর দিশা জাবির ‘তরী’

জাবি: বিকাল ৪টা। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আড্ডা বসেছে মুরাদ চত্ত্বর, শহীদ মিনার, বটতলা, টিএসসি, টারজান পয়েন্ট, পরিবহণ চত্ত্বরসহ বিভিন্ন জায়গায়। কেউ কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে খেলাধুলা করছে, কেউবা লাইব্রেরীতে পড়াশুনা করছে। আর নয়তো কেউ নাক ডেকে হলে ঘুমাচ্ছে। এ দৃশ্য গুলোর বহিরেও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) এক ঝাঁক তরুণ তাদের সময় পার করে মানবতার কাজে।

তারা আড্ডা, ঘুম কিংবা খেলাধুলা বাদ দিয়ে জ্ঞানের আলো ছড়াতে ব্যয় করে তাদের সময়। নিজের পড়াশুনার পাশাপাশি বিকালের এ সময়টায় তারা দরিদ্র পরিবারের সন্তান ও পথশিশুদেরকে শিক্ষা দিয়ে থাকেন। সপ্তাহে তিনদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাফেটেরিয়া চত্বরের খোলা আকাশের নিচে সমাগম হয় প্রায় ১২০ জন্য সুবিধা বঞ্চিত শিশুর। যাদের অনেকের গায়ে নেই পোশাক, আবার অনেকেরটা ছেড়া কিংবা ময়লা। তাদের দেখলেই মনে হবে হয়তো দুপুরে খাওয়া হয়নি।

তবুও  তারা স্বপ্ন দেখে, তারাও সম্পদ হতে চায়, তারাও শিক্ষিত হয়ে দেশ ও জাতির কল্যাণে এগিয়ে আসতে চায়। তাইতো ক্ষুধার যন্ত্রনা, বিরূপ পরিবেশ তাদেরকে ঘরে আটকে রাখতে পারেনি। তারা চলে আসে জ্ঞান আহরণ করতে। কিন্তু অপ্রত্যাশিত বাধা আর বিভিন্ন দুর্বলতার কারণে এসব শিশুদেরকে ঠিকমত বসার জায়গাও দেওয়া সম্ভব হয়না। তাই রাস্তার পাশে, গাছের নিচে শিশুদেরকে মাটিতে কিংবা পত্রিকার উপর বসিয়ে পাঠদান দিয়ে থাকে।

কিন্তু তাদের বাস্তবতা উল্টো। একটু বুজ হলেই মা-বাবা আর তাদেরকে পাঠাতে চান না তরীর এ পাঠশালায়। তাদেরকে রোজগারের জন্য চা, বাদাম বিক্রিসহ কোন একটা কাজে লাগিয়ে দেন। কিন্তু পথশিশুদের পড়ালেখা করার উদ্যমতা আর আগ্রহ দেখে নিরলস কষ্ট করে যাচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের এসব তরুণরা। তারা শুধু শিশুদেরকে শিক্ষাই দিচ্ছে না পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের বিনোদনের আয়োজনও করে থাকে।

এসবের মধ্যে থাকে কবিতা আবৃত্তি, নাচ, গানসহ নানা আয়োজন। এছাড়াও বিভিন্ন দিবসে তাদের জন্য অয়োজন করা হয় নানা ধরনের প্রতিযোগিতা। মাঝে মাঝে এসব শিক্ষার্থীদের জন্য নাস্তারও ব্যবস্থা করা হয়। তবে তা প্রতিদিন তা সম্ভব হয় না। কারণ তাদের আছে অর্থের প্রচুর সিমাবদ্ধতা। জানা যায়, ২০০০ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৯ ব্যাচের তারিক, শান্ত, ফয়সাল আহমেদসহ কয়েকজন ছাত্র চিন্তা করলো, বিকালের সময়টা আড্ডাবাজি না করে কিছু একটা করা দরকার।

এই চিন্তা থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ে যেসব শিশুরা বাদাম, চা বিক্রি করে তাদেরকে বিনা পয়সা পড়ানো শুরু করলেন। এভাবে তারা চার বছর বিশ্ববিদ্যালয়ে পথশিশুদের পড়ায়। একপর্যায়ে তাদেরও ক্যাম্পাস থেকে যাবার সময় হয়।

তখন তারা এ উদ্যেগকে একটা সংগঠনে রূপ দেয়ার চিন্তা করে। পরে ‘তরী’নামের একটি সংহঠন তৈরি করা হয়। সংগঠনটি প্রতিষ্ঠা হয়েই উদ্যোগ নিল ক্যাম্পাসের বাইরেরও সুবিধা বঞ্চিত শিশুদের পড়াশুনা করানোর। সে থেকে শুরু হয়ে এখনো চলছে তাদের এই কার্যক্রম।

এরই ধারাবাহিকতায় এবার ‘তরী’থেকে জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষা দিয়েছে ৪জন। গতবার প্রাইমারী স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষা দিয়েছিল ৮ জন। যারা সবাই অনেক ভাল রেজাল্ট করেছে।

তরীর বর্তমান সাধারণ সম্পাদক শফিকুল ইসলাম সাকিব ব্রেকিংনিউজকে জানান, এসব শিশুদের মেধা অনেক ভাল। পড়াশুনা করতে তারা অনেক আগ্রহী। কিন্তু অভিভাবকরা ছেলে একটু বড় হলেই টাকা উপার্জনের জন্য বিভিন্ন কাজে দিয়ে দিচ্ছে। আর মেয়েদেরকে দেয় বিয়ে।

তিনি আরও জনান, গত কিছুদিন আগে ৬ষ্ঠ শ্রেণীর এক ছাত্রীকে বিয়ে দেয়ার সব প্রস্তুতি সম্পূর্ণ করে তার বাবা-মা। কিন্তু আমাদের বাঁধায় তা দিতে পারেনি। এছাড়াও এখানে মনির নামের একটি ছেলে আসে যার বয়স পনের। সে ক্যাম্পাসেই রিকশা চালায়। কিন্তু বিকালে সে পাশে রিকশাটা থামিয়ে আমাদের এখানে পড়াশুনা করে। আমাদের স্বপ্ন বাংলাদেশের প্রতিটি প্রান্তে এ সংগঠন ছড়িয়ে যাবে। যে কোন সামর্থবান ব্যাক্তি ও সরকার এদের সাহায্যে এগিয়ে আসলে, আর কোন সুবিধা বঞ্চিত শিশু নিরক্ষর থাকবে না বলে জানান তিনি।

ব্রেকিংনিউজ.কম.বিডি/এমএ/এআর

আপডেট: শুক্রবার ৬ই জানুয়ারী ২০১৭ বিকাল ০৫:২৬:১২