বুধবার ৪ঠা জানুয়ারী ২০১৭ বিকাল ০৪:৪৪:৪৪

সিএনএন’র বিশেষ প্রতিবেদন

বিশ্ববাসীর কী এখনো রোহিঙ্গাদের আবেদন গ্রহণের সময় হয়নি?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক, ব্রেকিংনিউজ.কম.বিডি

বিশ্ববাসীর কী এখনো রোহিঙ্গাদের আবেদন গ্রহণের সময় হয়নি?

ঢাকা: নদীর তীরে কাদায় মুখ থুবড়ে পড়ে আছে এক ছোট্ট শিশু। প্রবাহমান জলের তরঙ্গ ধুয়ে দিচ্ছে তার শরীর। তবুও ঘুমিয়ে সে। অথৈ জলের ধারে কোমল মাটির বুকে অনন্ত নিষ্পাপ তার ঘুম। ওর মতো ভূমধ্যসাগরের তুরস্ক তীরে ঘুমিয়ে ছিল আয়লান কুর্দি- সিরীয় শিশু। যখন ওদের হাট্টিমাটিম, এক্কা-দোক্কা খেলার সময়, তখন ওদের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে জাতিগত হিংসা ও যুদ্ধ।

বাংলাদেশ-মিয়ানমারকে বিভক্তকারী নাফ নদীর ওপারে এমনিভাবেই পড়ে থাকতে দেখা যায় এক রোহিঙ্গা শিশুকে- ঠিক আয়লানের মতো উপুড় হয়ে। তার ছবি ভাইরাল হয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। প্রথমে তার পরিচয় মেলেনি। সোস্যাল মিডিয়ায় নাম হয়ে যায় আয়লান রোহিঙ্গা। পরে জানা যায় এই শিশুটির নাম মোহাম্মদ শোহায়েত। বয়স মাত্র ১৬ মাস।

এই আয়লান রোহিঙ্গাকে নিয়ে বুধবার ( ৪ জানুয়ারি) একটি বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে প্রভাবশালী মার্কিন সংবাদ মাধ্যম সিএনএন। রেভেকা রাইটস এর লেখা এই প্রতিবেদনে বিশ্ব বিবেকের কাছে প্রশ্ন রেখে সিএনএন বলেছে, এই শিশুর মৃত্যুও কী রোহিঙ্গাদের দিকে বিশ্ববাসীর নজর কাড়বে না? বিশ্ববাসীর এখনো কী রোহিঙ্গাদের আবেদন গ্রহণের সময় হয়নি?

আয়লান রোহিঙ্গা ঘুমিয়ে গেছে। ওর ঘুম ভাঙবে না আর। কিন্তু বিশ্ববিবেক আর কত দিন ঘুমিয়ে থাকবে? আর কত রোহিঙ্গার লাশ চাই বিশ্বমানবতার ঘুম ভাঙতে?

সিএনএন’র ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সেনা-পুলিশের সহিংসতা থেকে নিছক প্রাণ বাঁচাতেই মা-চাচা আর ৩ বছর বয়সী ভাইয়ের সঙ্গে বাংলাদেশে পাড়ি জমিয়েছিল ১৬ মাস বয়সী রোহিঙ্গা শিশুটি। 

মোহাম্মদের বাবা  জাফর আলম সিএনএনকে বলেন, আমি যখন এই ছবি দেখি, তখন আমার মনে হয় বরং আমি মরে যাই। এ পৃথিবীতে বেঁচে থেকে আমার আর কোনো লাভ নেই।

তিনি বলেন, তাদের নিরাপদ সীমান্ত পারাপারের ব্যবস্থা করতে আমি অন্য জায়গায় ছিলাম। ৪ ডিসেম্বর আমি যখন মোবাইলে আমার স্ত্রীর সঙ্গে সর্বশেষ কথা বলছিলাম, তখন আমার ছোট্ট ছেলেটি আমাকে আব্বা আব্বা বলে ডাকছিল।  কিছু সময় পরেই তাদের নৌকায় গুলি চালানো হয়। এর একদিন পর ৫ ডিসেম্বর একজন আমাকে ফোন করে আমার ছেলের মৃতদেহ খুঁজে পাওয়ার খবর জানায়। সে মোবাইলে একটি ছবি তুলে আমাকে পাঠায়। আমি বাকরুদ্ধ হয়ে যাই। আমার ছেলে সম্পর্কে কথা বলা আমার জন্য খুবই কষ্টের , বেদনার। সে খুবই বাবা ভক্ত ছিল। খুবই আকর্ষণীয় ও চঞ্চল ছিল। আমাদের গ্রামের প্রত্যেকেই তাকে স্নেহ করত, ভালবাসত।

গত ডিসেম্বরে প্রাণ বাঁচাতে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে নৌকায় বাংলাদেশে পাড়ি জমিয়েছিল মোহাম্মদের পরিবার। কিন্তু পথে তাদের ওপর গুলি চালায় দেশটির সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিজিপি) ও পুলিশ। নৌকা ডুবে যায় মিয়ানমারের ওসায়েকায়া নদীতে।  

সিএনএন বলছে, জীবননযাপন বা জাতিধর্মে আয়লান আর মোহাম্মদ হয়তো ভিন্ন। কিন্তু তাদের পরিবারের এই উদ্বেগ চির পরিচিত। মিয়ানমারের রোহিঙ্গা নাগরিকদের বিশ্বের সবচেয়ে নির্যাতিত সংখ্যালঘু জাতি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।মিয়ানমারে জন্ম নেয়া সত্ত্বেও রাখাইনদেরকে বাংলাদেশি অভিবাসী হিসেবে মনে করে মিয়ানমার সরকার।

জাফর আলম বলেন, সেনাবাহিনী  হেলিকপ্টারে চড়ে আমাদের বাড়ির উপরে গুলি চালিয়েছে। গণহারে গুলি চালিয়ে হত্যা করেছে। আমরা ঘর ছেড়ে জঙ্গলে আশ্রয় নেই। আমার  দাদা দাদীকে আগুনে পুড়িয়ে মেরেছে। আমাদের সমস্ত গ্রাম জ্বালিয়ে দিয়েছে।

যে কথা শুধুই জানে নদী 

জাফর আলম বলেন, এ গল্প হাজারো রোহিঙ্গা পরিবারের। আমার সন্তানের মত আরো কত রোহিঙ্গার লাশ ভেসে বেড়াচ্ছে সে খবর শুধু নদীই জানে। আমার আর কিছুই নেই। আমার স্ত্রী দুই ছেলে সবাই মরে গেছে। এখন সব কিছু শেষ। 

আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা বলছে, সম্প্রতি অন্তত ৩৪ হাজার রোহিঙ্গা সীমান্ত পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। জাফর আলম বর্তমানে টেকনাফে লেদা শরণার্থী ক্যাম্পে অবস্থান করছেন।

ব্রেকিংনিউজ.কম.বিডি/এনএআর

আপডেট: বুধবার ৪ঠা জানুয়ারী ২০১৭ সন্ধ্যা ০৭:০০:২৯