বুধবার ২৮শে ডিসেম্বর ২০১৬ বিকাল ০৫:৫৫:৫৭

উচ্চ আদালতে বছরের আলোচিত সব রায়

আব্দুল জাব্বার খান, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, ব্রেকিংনিউজ.কম.বিডি

উচ্চ আদালতে বছরের আলোচিত সব রায়

ঢাকা: বিদায়ের কড়া নাড়ছে ২০১৬ সাল। এ বছরে আইনাঙ্গণে ঘটেছে নানান ঘটনা। গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ পেয়েছে দেশের উচ্চ আদালত থেকে দেয়া বিভিন্ন রায় ও পর্যবেক্ষণ। সাধারণ মানুষ থেকে রাষ্ট্রপতি সবার অধিকার রক্ষা, ন্যায় বিচার ও শেষ আশ্রয়স্থল হিসেবে বছর জুড়েই আলোচনায় ছিল দেশের সর্বোচ্চ আদালত।

এ বছর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ আইন তৈরি, সংশোধন এবং মামলার রায় প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে আদালত অবমাননামূলক বক্তব্য দেয়ায় দুই মন্ত্রীকে জরিমানা, ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে বৈধতা প্রদান, বিনা বিচারে জেলখাটা কয়েকজনকে জামিন প্রদান, মানবতাবিরোধী অপরাধী নিজামী ও মীর কাসেমের ফাঁসির দণ্ড বহাল, মুফতি হান্নানের ফাঁসি বহাল ও বুশরা হত্যার সবাইকে খালাস দিয়ে রায় প্রদান।

দুই মন্ত্রীকে জরিমানা: 

আদালত অবমাননামূলক বক্তব্য দেয়ায় মন্ত্রী পদে বহাল থাকার পরও অর্থদণ্ড গুণতে হয়েছে দুই মন্ত্রীকে। প্রধান বিচারপতি ও বিচারাধীন বিষয় নিয়ে আদালত অবমাননাকর বক্তব্য দেয়ায় খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হককে দোষী সাব্যস্ত করে ৫০ হাজার টাকা করে জরিমানা করেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ।

নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা করে দুই মন্ত্রীর আবেদন খারিজ করে দিয়ে প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বাধীন আট বিচারপতির আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ গত ২৭ মার্চ এই আদেশ দেন।

রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে ইসলামকে বৈধ ঘোষণা: 

সংবিধানে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে ইসলামকে অন্তর্ভুক্তির বিধানের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে ২৮ বছর আগে দায়ের করা রিট সরাসরি খারিজ করে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম বৈধ বলে রায় দেন হাইকোর্ট।

গত ২৮ মার্চ বিচারপতি নাইমা হায়দারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের হাইকোর্টের বৃহত্তর বেঞ্চ এ রায় ঘোষণা করেন। ওই বেঞ্চের অন্য দুই সদস্য হলেন- বিচারপতি কাজী রেজা-উল হক ও বিচারপতি মো. আশরাফুল কামাল।

রিট আবেদনকারীদের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী জগলুল হায়দার আফ্রিক ও সুব্রত চৌধুরী। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মুরাদ রেজা। এছাড়া আদালতে রাষ্ট্রধর্ম বহাল রাখার পক্ষে শুনানিতে উপস্থিত ছিলেন সিনিয়র আইনজীবী বিচারপতি টিএইচ খান ও এবিএম নুরুল ইসলাম।

বিনা বিচারে কারাবাস কয়েকজনকে জামিন: 

রাজধানীর সূত্রাপুর থানার একটি হত্যা মামলায় গ্রেফতার হয়ে বিনা বিচারে ১৭ বছর ধরে কারাভোগ করা শিপনকে জামিন দিয়েছে হাইকোর্ট। এ খবর প্রকাশের পর আরও একাধিক ব্যক্তিকে জামিন দেন আদালত। আদালতের এমন রায়ে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে আসে বিষয়টি। যা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশ হয়।

জামায়াত নেতা নিজামী ও মীর কাসেমের ফাঁসি বহাল: 

বিদায়ী বছরের ৫ মে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জামায়াতের আমির মতিউর রহমান নিজামীর রিভিউ আবেদন খারিজ করে দিয়ে ফাঁসির দণ্ড বহাল রাখেন আপিল বিভাগ। এরপর ১০ মে রাতে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে নিজামীর ফাঁসি কার্যকর করা হয়। অন্যদিকে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে জামায়াতের আরেক নেতা মীর কাসেম আলীর ফাঁসি বহাল রেখে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয় ৩০ আগস্ট। তিনি গাজীপুরের কাসিমপুর কারাগারে তার ফাঁসি কার্যকর হয়।

ষোড়শ সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা: 

সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের অপসারণের ক্ষমতা সংসদের হাতে ন্যস্ত করে আনা সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী অবৈধ, বাতিল ও সংবিধান পরিপন্থী বলে রায় দেন হাইকোর্ট।

চলতি বছরের ৫ মে বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী, বিচারপতি কাজী রেজা-উল হক ও বিচারপতি আশরাফুল কামালের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের বিশেষ বেঞ্চ সংখ্যাগরিষ্ঠ মতের ভিত্তিতে এ রায় ঘোষণা করেন।

রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আইনসভার কাছে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের অপসারণের ক্ষমতা রয়েছে। দেশের সংবিধানেও শুরুতে এই বিধান ছিল। তবে সেটি ইতিহাসের দুর্ঘটনা মাত্র। রায়ে আরও বলা হয়, কমনওয়েলথভুক্ত রাষ্ট্রগুলোর ৬৩ শতাংশের অ্যাডহক ট্রাইব্যুনাল বা ডিসিপ্লিনারি কাউন্সিলরের মাধ্যমে বিচারপতি অপসারণের বিধান রয়েছে।

আদালত রায়ে আরও বলেন, বাংলাদেশের সংবিধানে ৭০ অনুচ্ছেদের ফলে দলের বিরুদ্ধে সাংসদরা ভোট দিতে পারেন না। তারা দলের হাইকমান্ডের কাছে জিম্মি। নিজস্ব কোনো সিদ্ধান্ত দেয়ার ক্ষমতা নেই। ৭০ অনুচ্ছেদ রাখার ফলে সাংসদদের সব সময় দলের অনুগত থাকতে হয়। বিচারপতি অপসারণের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়েও তারা দলের বাইরে যেতে পারেন না। যদিও বিভিন্ন উন্নত দেশে সাংসদদের স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত দেয়ার ক্ষমতা আছে।

রায়ে আরও বলা হয়, মানুষের ধারণা হলো, বিচারপতি অপসারণের ক্ষমতা সংসদের হাতে থাকলে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন হবে। সে ক্ষেত্রে বিচার বিভাগের প্রতি মানুষের আস্থা দুর্বল হয়ে যাবে। মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

বুশরা হত্যা মামলায় সব আসামি খালাস:

 ১৬ বছর আগে খুন হওয়া সিটি কলেজছাত্রী রুশদানিয়া বুশরা ইসলাম হত্যা মামলায় সব আসামিকে খালাস দেন আপিল বিভাগ। মামলা সূত্রে জানা যায়, ২০০০ সালের ১ জুলাই রামপুরার পশ্চিম হাজীপাড়ায় পুলিশের সাবেক কর্মকর্তা সিরাজুল ইসলামের মেয়ে সিটি কলেজের মার্কেটিং বিভাগের ছাত্রী রুশদানিয়া বুশরা ইসলাম কোনো এক সময়ে খুন হন। বুশরার পোস্টমর্টেম রিপোর্টে বলা হয়, তাকে ধর্ষণের পর ধারালো অস্ত্র দিয়ে হত্যা করা হয়েছে। কিন্তু আটক আসামিদের এ হত্যার সঙ্গে সম্পৃক্ততার কোনো প্রমাণ না পাওয়ায় সবাইকে খালাস দেয়া হয়।

বিজিএমইএ ভবন ভাঙা সংক্রান্ত হাইকোর্টের রায় বহাল: 

রাজধানীর হাতিরঝিলের পাশে গড়ে ওঠা বিজিএমইএ ভবনকে বিষ ফোড়া হিসেবে আখ্যায়িত করে বহুতল ভবন ভাঙতে হাইকোর্টের রায় বহাল রাখেন আপিল বিভাগ। স্বল্প সময়ের মধ্যে ভবন ভাঙতে ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা রয়েছে রায়ে।

ভোট ছাড়া স্কুল-কলেজের সভাপতি হতে পারবে না এমপিরা:

 সুপ্রিমকোর্টের আলোচিত আইনজীবী ড. ইউনুছ আলী আকন্দের দায়ের করা এক রিটের শুনানি শেষে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের গভর্নিং বডি ও ম্যানেজিং কমিটি প্রবিধানমালা ২০০৯-এর ৫ ধারাকে বাতিল করেন হাইকোর্ট। আদালতের এ আদেশের ফলে সংসদ সদস্যরা অভিভাবকদের ছোট ছাড়া ইচ্ছা করলেই স্কুল-কলেজের গভর্নিং বডির সভাপতি হতে পারবেন না। হাইকোর্টের দেয়া এ আদেশ আপিল বিভাগও বহাল রাখেন।

এছাড়া বিট্রিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরীর উপর গ্রেনেড হামলা মামলায় জঙ্গি নেতা মুফতি হান্নানসহ তিন জনের ফাঁসির রায় বহাল রাখেন আপিল বিভাগ।

ব্রেকিংনিউজ.কম.বিডি/এজেডখান/এসআই

আপডেট: বৃহঃস্পতিবার ২৯শে ডিসেম্বর ২০১৬ রাত ০২:৪৬:১৬