বুধবার ১৪ই ডিসেম্বর ২০১৬ দুপুর ০২:১৭:৪৭

সাঁওতালরা বিদ্রোহ করেই এগিয়ে যাবে

হোসেন নীল

সাঁওতালরা বিদ্রোহ করেই এগিয়ে যাবে

৬ ও ৭ নভেম্বর ২০১৬ তারিখে পূর্বপুরুষের জমি পুনরুদ্ধারের আন্দোলনরত সাঁওতালদের ওপর গাইবান্ধা জেলার সাহেবগঞ্জ ও বাগদা ফার্ম এলাকায় পুলিশ ও আওয়ামী সন্ত্রাসী বাহিনীর গুলিতে একজন সাঁওতাল নারীসহ ৪ সাঁওতাল নিহত হন, আহত হন অর্ধশতাধিক।

পুলিশ ও চিনিকল ব্যবস্থাপক আব্দুল আউয়াল আর সাপমারা ইউনিয়ন কাউন্সিল চেয়ারম্যান শাকিল আল বুলবুলের নেতৃত্বে বাহিনীসমূহ ৬০০ ঘরবাড়ি ও বিদ্যালয় আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয়- যা জমি পুনরুদ্ধারে আদিবাসী-বাঙালি সমন্বিতভাবে নির্মাণ করেছিল। জয়পুর, মাদারপুরসহ সাঁওতাল গ্রামগুলিতে চলে দমন-নির্যাতন। বর্তমানে আশ্রয়হীন শত শত সাঁওতাল জনগণ খোলা আকাশের নীচে কাজ ও খাদ্য সংকটে দিনযাপন করছেন।

১৯৬২ সালে পূর্ব পাকিস্তান সরকার রংপুর চিনিকলের ইক্ষু চাষের জন্ন্য আদিবাসী ও বাঙালি কৃষকদের প্রায় ১৮৪২ একর জমি অধিগ্রহণ করে। ফলে ১৫টি আদিবাসী গ্রাম ও ৫টি বাঙালি গ্রাম উচ্ছেদ হয়। গোবিন্দগঞ্জে উক্ত চিনিকল প্রতিষ্ঠা করার সময় এই শর্তে জমি অধিগ্রহণ করা হয় যে, কল বন্ধ হয়ে গেলে বা সেখানে আখ ছাড়া অন্য কিছু চাষ করলে সরকারিভাবে জমি পূর্বতন মালিকদের ফেরত দেয়া হবে।

বাংলাদেশের চিনিকলগুলো কল কর্মকর্তা ও শাসক প্রতিক্রিয়াশীলদের ভয়াবহ দুর্নীতির কারণে এক এক করে প্রায় সবই বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, কল কৃষকদের ইক্ষু যথাসময়ে নেয় না, অনেক টাকায় অনুমতিপত্র বিক্রি করে, ফলে সারা বছরের এই ফসলে অনেক ক্ষতি হয়, যথাসময়ে ইক্ষু দিতে না পারায় পঁচে যায় ও ওজন কমে যায়, কৃষক সর্বসান্ত হয়, অন্য ফসল চাষাবাদ করতে চায়, চিনিকলও আর ইক্ষু পায়না, তাই বন্ধ হয়ে যায় যেখানে কিনা চালু অবস্থায় দেশের চাহিদার শতকরা ১০ ভাগও চিনিকলগুলো মেটাতে পারেনা, বাকী নব্বই ভাগ চাহিদা মেটানো হয় বিদেশ থেকে নিম্ন মানের বিট চিনি আমদানি করে। লাভবান হয় আমদানি কারকরা। এরই অংশ হিসেবে দুর্নীতির ফল হিসেবে গোবিন্দগঞ্জের কল ২০০৪ সাল থেকে অধিকাংশ সময়ই বন্ধ থাকে। কিন্ত জমি ক্ষমতাসীনদের ইজারা দিয়ে সেখানে ধান ও তামাক চাষ করাচ্ছে।

সুতরাং চুক্তি মোতাবেক ওইসকল জমি সাঁওতাল ও বাঙালি পূর্বতন মালিকদের প্রাপ্য। সেই দাবিতে তারা পূর্বপুরুষের জমিতে ঘর বানান ও জমি পুনরুদ্ধারে গণ আন্দোলন সূচিত করেন। ৬ নভেম্বর সন্ধ্যায় পুলিশ প্রশাসন ও মিল কর্তৃপক্ষ ইক্ষু কাটার নামে ওইসব ঘরবাড়ি উচ্ছেদ করতে গেলে সংঘর্ষ বাঁধে। পুলিশ, মিল কর্তৃপক্ষ ও আওয়ামী সন্ত্রাসীরা সেসব ঘরবাড়ি ট্রাক্টর দিয়ে গুঁড়িয়ে দেয়। পুলিশ ও সন্ত্রাসীরা গুলি চালায় আর সাঁওতালরা তীর-ধনুক নিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। নিহত হন শ্যামল হেমব্রম, মঙ্গল মার্ডি, রমেশ টুডুসহ এক নারী সাঁওতাল জনগণ। লুটপাট, ঘরবাড়ী ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ আর নারী ও শিশুদের মারধর করে সন্ত্রাসীরা।

এ ঘটনা গোবিন্দগঞ্জের আওয়ামী এমপি আবুল কালাম আজাদ সাপমারা ইউনিয়ন কাউন্সিল চেয়ারম্যান শাকিল আলমের মাধ্যমে সরাসরি পরিচালনা করা হয়েছে। এরা চার বছর আগে ভূমি পুনরুদ্ধার আন্দোলন সূচিত হলে সহায়তা করেছিল আর চার বছরে প্রায় অর্ধকোটি টাকা চাঁদাও সাঁওতাল জনগণ দিয়েছেন আন্দোলনের আইনি কাজের জন্য। বুর্জোয়া-সামন্তরা এখন তাদের আসল চেহারা প্রদর্শন করেছে। তাই উচ্ছেদকৃত জনগণ এমপির দেয়া ত্রাণ গ্রহণ করেননি। পুলিশ গ্রেফতারকৃত সাঁওতালদের হাসপাতালেও হাতকড়া পড়িয়ে রেখেছিল।

এ ঘটনার তাৎপর্য হচ্ছে আদিবাসী ও বাঙালি ভূমিহীনদের জমির জন্য সংগ্রামই বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলের সমাজের বিপ্লবী রূপান্তরের সংগ্রামের মেরুদণ্ড। এই ভুমি দখলের সংগ্রামের মাধ্যমেই কৃষক জনগণ পরিষ্কারভাবে তাদের শত্রু-মিত্র চিহ্নিত করতে সক্ষম হবেন। সাম্যবাদের মতাদর্শের আলোকে বিপ্লবের পথে এগিয়ে যেতে পারবেন। আর সাঁওতাল জনগণের রয়েছে মহান বিদ্রোহের ইতিহাস। ঐতিহাসিক সাঁওতাল বিদ্রোহ উপমহাদেশে ব্রিটিশ প্রত্যক্ষ উপনিবেশের অবসানে বিরাট ভূমিকা রেখেছে।

সাঁওতাল জাতি বৃহৎ বাঙালি জাতি গঠনে নৃ-তাত্ত্বিক অবদান রেখেছে। আদিবাসীদের যারা ছোট করে দেখে তারা এই জিনিসটা মানেনা। সত্যি বলতে কি তাদের শ্রেণিস্বার্থ তাদের মানুষে মানুষে বিভেদ সৃষ্টি করতে চালিত করে। ভয়ংকর দুর্নীতির মাধ্যমে চিনিকলসহ সকল দেশজ শিল্প এরাই ধ্বংস করেছে। এরা যেমন কৃষককে অন্যায়ভাবে জমি থেকে বঞ্চিত করে রেখেছে তেমনি শ্রমিককেও বাঁচার মত মজুরি দেয় না, দেশের জনগণের স্বার্থ রয়েছে যেসব উৎপাদনে তা বন্ধ করে দেয়। কিন্তু নিপীড়িত আদিবাসী-বাঙালিরা এর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করবেন ও আরও সামনে এগিয়ে যাবেন স্বাভাবিকভাবেই।

লেখক: কলাম লেখক

আপডেট: বুধবার ১৪ই ডিসেম্বর ২০১৬ দুপুর ০২:১৭:৪৭