মঙ্গলবার ২৯শে নভেম্বর ২০১৬ রাত ০১:০২:৪৮

চিরায়ত ঐতিহ্যের প্রতীক পালকি

ফিচার ডেস্ক, ব্রেকিংনিউজ.কম.বিডি

চিরায়ত ঐতিহ্যের প্রতীক পালকি

ঢাকা: এই পালকিতে চড়েই একদিন কুলীন বধূ বাপের বাড়ি ছেড়ে স্বামীর বাড়ি যাত্রা করতো। এই পালকিতে চড়েই বিহারে যেতো ধনীর দুলালি। রাজা, প্রজা, উজির-নাজির কে না চড়েছে এই ঐতিহ্যবাহী বাহনটিতে। 

কিন্তু কালের বিবর্তনে উন্নত হচ্ছে সভ্যতা। কতো কিছু পাল্টায়, পাল্টায় সংস্কৃতি, সভ্যতা সেই সঙ্গে পাল্টে যায় মানুষের জীবনধারা। উন্নত হয় যানবাহন, সমাজ। সমাজের এই পরিবর্তনের রেশ ধরেই হারিয়ে যায় গ্রাম বাংলার সংস্কৃতির সুপরিচিত অনেক পুরনো ঐতিহ্য। এই হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যের মধ্যে পালকি অন্যতম।

গ্রাম-বাংলায় এখন আর সে বাহনটি দেখা যায় না। এক সময় বাংলার সবুজ শ্যামল মেঠো পথে প্রায়ই চোখে পড়ত পালকি। গাঁয়ের পথে পালকিতে করে নববধূকে নিয়ে যাওয়ার দৃশ্য দেখতে যুবতী মেয়েসহ অনেকেই বাড়ির ভেতর থেকে উঁকি-ঝুঁকি মারত। ছয় বেহারা পালকি কাঁধে নিয়ে অদ্ভূত ছন্দ তুলে নতুন বৌকে নিয়ে শ্যামল বাংলার মেঠোপথে চলত। পালকির সঙ্গে ছিল বাংলাদেশের তরুণ-তরুণীদের আবেগ গাঁথা এক সম্পর্ক। নতুন বধূকে নিয়ে বেয়ারারা নানা সুখ-দুঃখের গান গেয়ে দুলকি চালে চলত। আর ভেতরে বর এবং কনে লজ্জা গুছিয়ে তাদের প্রথম সাক্ষাৎ সেরে নিত।

পালকি! বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী এক প্রাচীন বাহন। মানুষ বহন করার কাজেই এ পালকি ব্যবহার হয়ে থাকে। বিলাসবহুল বাহন হিসেবেই এর পরিচিতি। প্রাচীনকালে সাধারণত ধনিকগোষ্ঠী এবং সম্ভ্রান্ত বংশের লোকেরা এর মাধ্যমে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ভ্রমণ করতেন।

পালকি চাকাবিহীন এক বাহন। তাই কয়েকজন মানুষকেই এই পালকি ঘাড়ে করে বহন করতে হয়। সাধারণত পালকিকে কয়েকজন ঘাড়ে ঝুলিয়ে সামনের দিকে অগ্রসর হতে থাকে। যারা পালকিকে ঘাড়ে বা, কাঁধে করে বহন করে থাকেন তাদের পালকির বেহারা বা, কাহার বলে। পালকির ভেতরে ১ জন বা, ২ জন থাকত, আর পালকির বেহারা হিসেবে থাকত ২ থেকে ৮ জন। আজ আমরা গ্রাম বাংলার এই হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্য পালকির ইতিহাস-ঐতিহ্য, উৎপত্তি থেকে শুরু করে আরো কিছু বিষয়ে জানার চেষ্টা করব।

পালকির ইতিহাস

ধারণা করা হয় প্রাচীনকালে দেব-দেবীকে আরোহন বা, দেব-দেবীর মূর্তি বহনের জন্য পালকি সদৃশ বাহন ব্যবহার করা হতো। অনেক প্রাচীন মন্দিরেই পালকি দিয়ে দেবতাদের বহনের দৃশ্য ভাস্কর্য আকারে তুলে ধরা হয়েছে। হিন্দুদের রামায়নেও আনুমানিক খ্রীষ্টপূর্ব ২৫০ সালের সময়ের দিকে পালকির উল্লেখ পাওয়া যায়। ব্রিটিশ শাসন আমলে ইউরোপের উচ্চ শ্রেণির সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিরা এই পালকিতে চলাচল করতেন। তবে উপমহাদেশে রেলগাড়ি প্রচলেন পর ব্রিটিশ কর্মকর্তাদের মাঝে পালকির ব্যবহার অনেকটাই কমে আসে।

ইউরোপের পালকিগুলোকে শোবার উপযোগী করে বানানো হতো। কোন কোন পালকি খোলা হতো আবার কোনটি হতো বন্ধ। মিশরীয় চিত্রকর্মেও পালকির দেখা পাওয়া যায়। পারস্য রাজ্যেও পালকির অস্তিত্ব ছিল। বিখ্যাত পরিব্রাজক ইবনে বতুতা থেকে শুরু করে চতুর্দশ শতকে পর্যটক জন ম্যগনোলি ভ্রমণের জন্য পালকি ব্যবহার করতেন বলে জানা যায়। সম্রাট আকবরের শাসন আমলে এবং তারও পরবর্তী সময়ে সেনাধ্যক্ষদের যাতায়াতের জন্য প্রধান বাহন হিসেবে পালকিই ব্যবহৃত হতো।

পালকির বিভিন্ন নাম

পালকি শব্দটি এসেছে সংস্কৃত “পল্যঙ্ক” বা, “পর্যঙ্ক” থেকে। এর অর্থ বিছানা বা খাট। হিন্দি এবং বাংলা উভয় ভাষায় এটাকে পালকি বলা হয়ে থাকে। পালি ভাষায় একে “পালঙ্ক” বলা হয়। এই যানকে কোন কোণ জায়গায় ডুলি, শিবিকা এসব নামেও ডাকা হয়। পর্তুগিজরা এর নাম দিয়েছিলো পালাঙ্কুয়িন।

রোমে লেটিকা, চীনে জিয়াও, ভিয়েতনামে কিউ, স্পেনে লিটারা, ফ্রান্সে পালানকুইন, পর্তুগালে লিটেইরা, থাইল্যান্ডে ওহ, কোরিয়ায় গামা, জাপানে নোরিমোনো, তুরস্কে টাহটিরেভান ইত্যাদি নামে পালকি পরিচিত হয়ে আসছে। লন্ডনে পালকিকে সিড্যান চেয়ার বলে ডাকা হয়। চীনের সনাতনি ধারায়ও এই সিডান চেয়ারের ব্যবহার দেখা যায়।

                                         ১৭৭৫ সালে রবার্ট অ্যাাডাম অঙ্কিত সিড্যান চেয়ার (Source: bn.wikipedia.org)

বাংলাদেশের পালকি

বাংলাদেশে এক সময় অভিজাত শ্রেণির লোকেরা এই বাহনে চলাচল করতো। দীর্ঘদিন ধরে বিয়ে এবং অন্যান্য অনুষ্ঠানেও এর ভালই প্রচলন ছিল। বিয়েতে বর এবং কনের জন্য পালকি ব্যবহারের প্রথা চালু ছিল। এছাড়াও অসুস্থ মানুষকে হাসপাতালে বা, অক্ষম মানুষকে বিভিন্ন স্থানে নেয়ার জন্যও পালকি ব্যবহার হতো।

বাংলাদেশের পালকিগুলো বিভিন্ন আকৃতির হয়ে থাকে। এর গঠন শৈলীতেও রয়েছে ভিন্নতা। সবচেয়ে ছোট এবং সাধারণ নকশার পালকিকে ডুলি বলা হয়। এই ডুলি সাধারণত ২ জন বহন করে নিয়ে চলে। বাংলাদেশে এক সময় হাড়ি, মাল, দুলে, বাগদি বা, উড়ি প্রভৃতি সম্প্রদায়ের লোক পালকি বহনের কাজ করতো। এরা পালকি বহনের পাশাপাশি দিনমজুরের কাজ এবং মাছের ব্যবসাও করতো।

কাঠমিস্ত্রীরা সেগুন কাঠ, শিমুল কাঠ, গান কাঠ প্রভৃতি কাঠ দিয়ে তৈরি করতো পালকি। পালকির বহন করার দন্ডটিকে বাঁট বলে। এই বাঁট তৈরি হত বট গাছের বড় ঝুরি দিয়ে। তখন বাংলাদেশে তিন রকমের পালকি দেখা যেতো। সাধারণ পালকি, আয়না পালকি এবং ময়ূরপঙ্খি পালকি। সাধারণ পালকি দেখতে আয়তাকার ছিল। ঢালু ছাদ এবং চারদিকে কাঠের আবরণ এর প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল। এর দু দিকে দুটি দরজাও থাকতো।

আয়না পালকির বৈশিষ্ট্য হলো এতে আয়না লাগানো থাকতো। ভেতরে চেয়ারের মতো দুটি বসার জায়গা এবং একটি টেবিলে রাখা হতো। তবে আয়তনের দিক থেকে বলতে গেলে ময়ূরপঙ্খী পালকি সবচেয়ে বড়। এই পালকিটি ময়ূরের আকৃতিতে তৈরি করা হয়। এর ভেতরে দুটি চেয়ার, একটি টেবিল এবং একটি তাকও থাকতো।

                                                             কোরিয়ার পালকি গামা (Source: bn.wikipedia.org)

তবে উনবিংশ শতাব্দীতে এসে সড়ক ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতির ফলে যাতায়াতের বাহন হিসেবে পালকির ব্যবহার প্রায় বন্ধই হয়ে যায় বলা চলে। বিশেষ করে ১৯৩০ এর পর থেকে শহরাঞ্চলে রিকশার প্রচলন শুরু হলে পালকির ব্যবহার উঠে যায়। বর্তমানে আমাদের পালকিকে আমাদের অতীত ঐতিহ্যের নিদর্শন হিসেবেই ধরা হয়। বেহারাদের কাঁধ থেকে পালকির স্থান এখন হয়েছে বিভিন্ন জাদুঘরে। সভ্যতা এবং বাস্তবতার কথা চিন্তা করলে পালকিকে হয়ত আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। যুগ পাল্টে গেছে রাজা নেই বাদশাহ নেই, তাই  পালকি ও বেহারাও নেই। আমাদের নতুন প্রজম্ম পালকি নামক মানুষের ঘাড়ে চড়া বসা কোনো বাহনের কথা বই-পুস্তকে পড়বে এবং লোকশিল্পের জাদুঘরে গিয়ে সাজানো গোছানে কৃত্রিম পালকি দেখবে।

পালকির প্রচল কখন, কবে এবং কে করেছিলেন জানা নেই। তবে একালে বাংলাদেশ সহ ভারত উপমহাদেশে এর ছিল ব্যাপক প্রচলন। আভিজাত্য আর পরিবহনের একমাত্র মাধ্যম। আভিজাত পরিবারের কন্যা, বধূ, সমাজের উঁচুস্তরের মানুষ এবং নববধূ পরিবহনের অন্যতম মাধ্যম ছিল পালকি। ধনী-গরিব যাই হোক পালকি ছাড়া নববধূকে বরণ করা ছিল তখন কল্পনার বাইরে। কিন্তু আজ এ সবই কালের গর্ভে বিলীন প্রায়।

ব্রেকিংনিউজ/ এমআর

আপডেট: মঙ্গলবার ২৯শে নভেম্বর ২০১৬ সকাল ১১:২৯:৫১