রবিবার ২৩শে অক্টোবর ২০১৬ দুপুর ০২:২৫:১৩

তোমাকে পাওয়ার জন্যে আর কতবার ভাসতে হবে রক্তগঙ্গায়?

শিল্প-সাহিত্য ডেস্ক, ব্রেকিংনিউজ.কম.বিডি

তোমাকে পাওয়ার জন্যে আর কতবার ভাসতে হবে রক্তগঙ্গায়?

ঢাকা: আধুনিক বাংলা কবিতার অন্যতম প্রধান কবি শামসুর রাহমানের ৮৮তম জন্মদিন আজ রবিবার (২৩ অক্টোবর)। ১৯২৯ সালের ২৩ অক্টোবর পুরান ঢাকার মাহুতটুলীতে বাংলা কবিতার অন্যতম প্রধান এই কবি জন্মগ্রহণ করেন। শামসুর রাহমানের ৮৮তম জন্মদিন উপলক্ষে বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের আয়োজনে নানা কর্মসূচি রয়েছে।

বাংলা ভাষা, স্বাধীনতা, অসাম্প্রদায়িক চেতনা আর মুক্তবুদ্ধির অগ্রদূত কবি শামসুর রাহমানের কবিতার ভাঁজে ভাঁজে ছড়িয়ে আছে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘ্রাণ। এ জন্য তাকে ‘স্বাধীনতার কবি’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়।

শামসুর রাহমান বাংলা কবিতার অন্যতম প্রাণপুরুষ। তার কবিতায় শুধু স্বাধীনতাই নয়; মৌলবাদ, ধর্মান্ধতা, প্রেম, দ্রোহ ও বিশ্বজনীনতা সবই উঠে এসেছে। তা আজও আমাদের উজ্জীবিত করে। পঞ্চাশের দশক থেকে বাঙালি জাতির নানা সংগ্রাম, মুক্তিযুদ্ধ, সামাজিক জীবনের অসঙ্গতি, ব্রিটিশ ও পশ্চিমাদের শোষণের বিরুদ্ধে তার সোচ্চার কণ্ঠে কবিতায় নির্মিত হয় এক অনন্য বাকপ্রতিমা।

সাংবাদিকতায় কবি শামসুর রাহমানের অবদান ছিল অপরিসীম। স্বাধীনতা পুরস্কার, একুশে পদক, বাংলা একাডেমি পুরস্কারসহ অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন। ২০০৬ সালের ১৭ আগস্ট টানা ১২ দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি।

কবির স্মরণে আজ রবিবার বিকাল ৪টায় বাংলা একাডেমি, জাতীয় কবিতা পরিষদ ও শামসুর রাহমান স্মৃতি পরিষদ যৌথভাবে বাংলা একাডেমির রবীন্দ্র চত্বরে আলোচনাসভা, তাকে নিবেদিত কবিতা পাঠ, তার কবিতা থেকে আবৃত্তি ও সংগীতানুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে।

মা, মাটি ও মানুষের কথা বলা স্বদেশের ভাবনাতাড়িত এক কবি শামসুর রাহমান। কাব্য রচনায় ছন্দোময় ও শিল্পিত শব্দের প্রক্ষেপণে ধারণ করেছেন বাঙালির ও বাংলা ভাষার অনন্য কবির পরিচয়। আপন কাব্যশৈলীর গুণে তিনি আবির্ভূত হয়েছিলেন জীবনানন্দ দাশের পরে বাংলা কাব্যভুবনে সবচেয়ে আলোচিত কবির পরিচয়ে। সমকালীনতা ধারণকারী অনন্য প্রতিভায় উজ্জ্বল ওই নাগরিক কবি ছিলেন বাংলাদেশ ও আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবি। কবিতায় সৃষ্টি ও মননের জ্যোতির্ময় উপস্থাপনা তাকে দিয়েছে কবিতার বরপুত্রের উপাধি। তাই কবি বেঁচে থাকবেন বাঙালির হৃদয়ে প্রজন্মের পর প্রজন্ম।

১৯৫৭ সালে শামসুর রাহমান সাংবাদিকতা জীবন শুরু করেন ইংরেজি দৈনিক মর্নিং নিউজের সহ-সম্পাদক হিসেবে। ১৯৬০ সালে রেডিও পাকিস্তানে যোগ দিয়ে, পরে ১৯৬৪ সালে মর্নিং নিউজে উচ্চতর পদে যোগ দেন। ১৯৬৪ সালের শেষ দিকে প্রেস ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনায় ও প্রবীণ সাংবাদিক আবুল কালাম শামসুদ্দীনের সম্পাদনায় দৈনিক পাকিস্তান পত্রিকায় সহকারী সম্পাদক পদে তিনি যোগদান করেন। পুরো এক দশক (১৯৭৭-১৯৮৭) শামসুর রাহমান দৈনিক বাংলা ও সাপ্তাহিক বিচিত্রার সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। শামসুর রাহমানের কবিতার বিষয়বস্তু ছিল প্রেম, মানবিকতা, স্বাধীনতা, ভাষার পক্ষে ও অসাম্প্রদায়িকতা আর অত্যাচারের বিরুদ্ধে।

বাংলাদেশের ভাষা সংগ্রাম ও স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতিটি ধাপে তার কবিতা ছিল অনুপ্রেরণার নাম। দেশমাতৃকার জন্য তার কবিতা স্লোগান, ব্যানার ও দেয়াল লিখনে এমনকি মুখে মুখে ব্যবহার হয়েছে অহরহ। নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের সময়েও শামসুর রাহমানের কলম থেমে থাকেনি। নাগরিক কষ্ট আর সুখ-দুঃখের সমীকরণও উঠে আসে তার কবিতায়। তার কবিতা ব্যক্তিগত ও নৈর্ব্যক্তিক- একই সঙ্গে গীতিময় ও মহাকাব্যিক। বাংলা কবিতায় আধুনিকতা, ব্যক্তির নৈঃসঙ্গ্য, বিবমিশা ও আনন্দলহরীর অনিন্দ্য এক রূপকার শামসুর রাহমান।

'নিজ বাসভূমে', 'বন্দী শিবির থেকে', 'দুঃসময়ে মুখোমুখি', 'ফিরিয়ে নাও ঘাতক কাঁটা', 'বাংলাদেশ স্বপ্ন দ্যাখে', 'ইকারুশের আকাশ', 'উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ', 'যে অন্ধ সুন্দরী কাঁদে', 'অস্ত্রে আমার বিশ্বাস নেই', 'দেশদ্রোহী হতে ইচ্ছে করে', 'বুক তার বাংলাদেশের হৃদয়', 'ভস্মস্তূপে গোলাপের হাসি' প্রভৃতি কাব্যগ্রন্থের শিরোনামই কবির স্বদেশচিন্তার অন্যতম দলিল। স্বাধীনতা তুমি; বন্দী শিবির থেকে; বর্ণমালা, আমার দুঃখিনী বর্ণমালা; তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা; আসাদের শার্ট; ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯ কবিতাগুলো তার স্বাধীনতাকামী মনের পরিচয় বহন করে।

শামসুর রাহমানের প্রথম কাব্যগ্রন্থ 'প্রথম গান দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে' প্রকাশিত হয় ১৯৬০ সালে। ১৯৪৩ সালে তার প্রথম কবিতা 'উনিশ শ' ঊনপঞ্চাশ' প্রকাশিত হয় নলিনীকিশোর গুহ সম্পাদিত সোনার বাংলা পত্রিকায়। ৬০টির অধিক কাব্যগ্রন্থ ও প্রায় শতাধিক গ্রন্থের জনক শামসুর রাহমান কবিতার পাশাপাশি করেছেন বেশ কিছু অনুবাদের কাজ। অনুবাদগুলোর মধ্যে ইউজিন ও' নীলের মার্কোমিলিয়ানস, রবার্ট ফ্রস্টের নির্বাচিত কবিতা, খাজা ফরিদের কবিতা, টেনেসি উইলিয়ামের হৃদয়ের ঋতু।

বাংলা সাহিত্যে অবদানের জন্য শামসুর রাহমান ১৯৬৩ সালে আদমজী পুরস্কার, ১৯৬৯ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার, ১৯৭৩ সালে জীবনানন্দ পুরস্কার, ১৯৭৭ সালে একুশে পদক, ১৯৮১ সালে আবুল মনসুর আহমদ স্মৃতি পুরস্কার, ১৯৯২ সালে স্বাধীনতা পুরস্কার লাভ করেন। এ ছাড়া সাংবাদিকতায় অবদানের জন্য ১৯৮২ সালে তিনি জাপানের মিৎসুবিশি পুরস্কার পান। ১৯৯৪ সালে কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকা তাকে আনন্দ পুরস্কারে ভূষিত করে। ওই বছর তাকে সাম্মানিক ডিলিট উপাধিতে ভূষিত করে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়। ১৯৯৬ সালে সাম্মানিক ডিলিট উপাধি প্রদান করে কলকাতার রবীন্দ্রভারতী।

সকালে কবির সমাধিতে বাংলা একাডেমি, জাতীয় কবিতা পরিষদ, শামসুর রাহমান স্মৃতি পরিষদ, বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোটসহ বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন পুস্পস্তবক অর্পণ করবে। আজ বিকেল ৪টায় বাংলা একাডেমি, জাতীয় কবিতা পরিষদ ও শামসুর রাহমান স্মৃতি পরিষদ যৌথভাবে একাডেমির রবীন্দ্র চত্বরে আলোচনা, নিবেদিত কবিতা পাঠ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। এতে সভাপতিত্ব করবেন বাংলা একাডেমি ও শামসুর রাহমান স্মৃতি পরিষদের সভাপতি ইমেরিটাস অধ্যাপক আনিসুজ্জামান। আলোচনায় অংশ নেবেন সংস্কৃতিজন রামেন্দু মজুমদার, কবি রবিউল হুসাইন, কবি মুহম্মদ নুরুল হুদা ও অধ্যাপক রফিকউল্লাহ খান।

সমকালীন বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি শামসুর রাহমান ২০০৬ সালের ১৮ আগস্ট ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর স্মরণে আজকের দিনকে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছে কবি, শিল্পী-সাহিত্যিক ও সুশীল সমাজসহ নানা সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন।

ব্রেকিংনিউজ/ এমআর

আপডেট: রবিবার ২৩শে অক্টোবর ২০১৬ দুপুর ০২:২৫:১৩